বুধবার, ১০ জুলাই, ২০১৩

মামা কাহিনী।

ঘটনাটা আমার মামাকে নিয়ে।স্বপন মামা আমার অত্যান্ত প্রিয় একজন মানুষ,শুধু মামাই নয় সে আমাদের ভাগ্নেদের বন্ধু।কারন উনি বয়সেও আমাদের থেকে অল্পকিছু বড়।জীবনে উনার যতটাকা আমরা নস্ট করছি,সে বলার মত না।একটুও বাড়িয়ে বলছি না,উনি আমাদের কখনো না বলেননি কোন কিছু কেনার ব্যাপারে।সেই মামা শেষপর্যন্ত প্রেমে পড়লো,উনাদেরই এলাকার আমার বর্তমান মামীর সাথে।আল্লাহর অসীম রহমত মামীও মামার মতই আমাদের বন্ধু।

ঘটনাটাই বলি,মামা এলাকায় যুবকদের নেতা,রাজনীতি করেন, বলতে কি এলাকার সকল ব্যাপারে উনি আর উনার দল এতোই অগ্রগামী যে এলাকার চেয়ারম্যান ,মেম্বার উনার শত্রু হয়ে গেলো স্বার্থের দ্বন্দে।এলাকার বিচার-আচার পর্যন্ত তারা নিয়ন্ত্রন করতো।ফলে চেয়ারম্যান ও মেম্বার এ ব্যাপারটায় বিশেষ ক্ষুদ্ধ।তার উপর রিলিফ আসলে মামার দল এতো বেশী হিসাব রাখতো যে,চেয়ারম্যান পদটার প্রতি চেয়ারম্যানের বিরক্তি এসে গেছে।উনি ঢাকায় উনার ব্যবসা প্রতিস্টানে বেশী সময় দেয়া শুরু করলো।

যেই মামা এতো নীতিবান,সমস্ত অসামাজিক ব্যাপার গুলো নিয়ন্ত্রনে সিদ্ধহস্ত তিনি প্রেমে পড়লেন।এক সন্ধ্যায় উনি মামীকে নিয়ে যখন একটু আবেগঘন মুহুর্তে ব্যস্ত,উনারা তখন রাগ-অনুরাগ পর্ব চালাচ্ছিলেন।এই অসতর্ক মুহুর্তে হঠাত কে যেনো টর্চের আলো তাদের গায়ে নিক্ষিপ্ত করলো।মামা ক্ষুদ্ধ হয়ে জিজ্ঞেস করলো-কে রে? মেম্বার বললো-জ্বি আমি।

আমার মামা যা বোঝার বুঝে নিলেন।সর্বনাশের চুড়ান্ত হয়েছে।এখন শুধু আল্লাহ ভরসা।মেম্বার এখন ব্যাপারটা নিয়ে কি ঘটাবেন,তা আমার মামা সেকেন্ডের চার ভাগের এক ভাগ সময়ে বুঝে গেলেন।বাকী ঘটনাটা আমি মামার জবানিতে বলি,-
বুঝলি ভাইগ্না আমার তো যা সর্বনাশ হইছে তা হইছে,আমি তখন চিন্তা করতেছি তোর মামীর ভাইদের ব্যাপারে আর চেয়ারম্যানের ব্যাপারে।তোর মামীর সমুহ বিপদ।সাথে সাথে আমার মাথায় রাগ আর একটা কুবুদ্ধি একিই সাথে চাঁপলো,যেটা সচরাচর ঘটেনা।আল্লাহর রহমত আর কি।যেখানে দুইজন দাঁড়িয়েছিলাম,তার পাশেই ছিলো একজনের রান্নাঘর।সেখান থেকে দাঁও একটা নিয়ে হুঙ্কার দিয়ে মেম্বারকে দৌড়ানো শুরু করলাম।চেয়ারম্যানও ঐদিন গ্রামে।মেম্বার প্রান বাঁচাতে সেদিকে দৌড়াতে থাকলো।চেয়ারম্যান অফিসে আগে মেম্বারই দৌড়িয়ে ঢুকলো,তার পিছে দাঁ নিয়ে আমি।দুজনই মারাত্বক হাফাচ্ছি।অফিসে সেসময় কি একটা গ্রাম্য সালিস চলছিলো।মেম্বার কিছু বলার আগেই আমি বললাম -শুনেন আপনারা এই মেম্বার অনেকদিন আমার চরিত্র হানিকর কথা বলে বেড়াচ্ছিলো,আজ হাতেনাতে তাকে পাইছি।আমি তাকে খুন করে জেলে যাবো।দরকার নাই এই জীবনের।

চেয়ারম্যান মেম্বারকে জিজ্ঞেস করলো,কি ব্যাপার?অত্যান্ত আশ্চর্যের ব্যাপার যে আমার মামাকেও সে অবাক করে দিয়ে বললো-স্বপন ভাই,আমি ভুল করছি।আমারে ক্ষমা করে দিয়েন।আসলে এমন নাটকীয় সমাপ্তি মামা নিজেও আশা করেনি।

নটে শাঁকটি মুড়োলো,আমার গল্প ফুরোলো।

মামা কাহিনী-২

আমি যে কিঞ্চিৎ বই পড়তে ভালোবাসি এবং আরামপ্রিয় এটা সম্ভবত আমার বড় মামার থেকে আমি পেয়েছি,না ভুল বললাম আমার নানাও বেজায় পড়ুয়া লোক ছিলেন।ঐ যে কথা আছে না নরানং মাতুলক্রম,তেমনি আর কি।আমার মামা এমনিতে খাটি কুমিল্লাইয়া ভাষায়ই কথা বলেন ,কিন্তু কেউ যখন কোন প্রশ্ন উনার কাছে জানতে আসেন,তখনি উনার মাঝে একটা ব্যাপক জ্ঞানী ভাব এসে যায়(এটা আমারও আছে,কি করবো রক্তের তাছির)উনি হঠাত করে শুদ্ধ ভাষার সাথে ইংরেজীর একটা প্রবল মিক্স দেন।

উদাহরন স্বরুপ কেউ উনাকে প্রশ্ন করলেই উনি যথাবিহিত ভাব-গাম্ভীর্য সহকারে বলতো- না, আসল সেরকম না,প্লাস ঘটনাকে অন্যভাবে দেখলে,মানে ইন দ্য মিন টাইম এমনি আরো অনেক জিনিস আসতো।আমি খুবই বিরক্ত হতাম,কিন্তু মামা আমাকে আসলে খুবই ভালোবাসতো।মাঝে মাঝে উনি কিছু কথা বলতো,সেটা ঠিক গ্রামের মানুষের কাছ থেকে আমি কখনো শুনিনি।উনি প্রায় বিরক্ত বোধ করলে বলতো,এই তোঁরা এখন যা,আমাকে একা থাকতে দে। তখন দু-একজন ঠাঠ্যা করে বলতো,আয় আয় উনি এখন একা থাকবেন।

একদিনের কথা মনে আছে নানার বাড়ির পাশে একটা পুরাতন ব্রীজ আছে,সেটার রেলিং এর একপাশ সম্পুর্ন ধসে গেছে,শুধু মাঝের লোহায় এক খন্ড কংক্রিটের টুকরো কিভাবে যেনো ঝুলে আছে।আমার মামার সঙ্গী একজন বললো-বৈরাম খাঁ ভাই(আমার মামার নাম)দেখছেন পুরা রেলিং ধইস্যা গেছে কিন্তু এই হালার টুকরাডা কেমনে জানি একা একা ঝুইল্লা আছে।হেই বেডাই ও আমনের লাহান একা থাকতে চায়।আমি সাথে থাকায় মামা প্রচন্ড রেগে গিয়েছিলেন,কারন আমি হাসি দিয়ে ফেলছিলাম।

উনি যে খুব আলসে ব্যাপারটা আসলে তা না।উনার জমি-জিরাত থেকে ভালোই উনি পেতেন।কিন্তু কোন উচ্চাশা ছিলো না।গোয়ালঘর এ সবসময় আমি গরু-ছাগল দেখেছি,কিন্তু কোন বানিজ্যিক উদ্দেশ্য ছিলো না।পশু-পাখি গুলো অনেকদিন ধরে দেখতাম একিই থাকতো,পরিবারের সদস্যের মতো।বছরের পর বছর একিই গুলাকে দেখতাম।বাজারে দোকান যেটা ছিলো সেটাও দায়সারা গোছে চলতো।খুব বেশি মালামাল তাতে থাকতো না।উনি মন চাইলে বসতেন নয়লে নয়।

কিন্তু যেহেতু রাজার ভাণ্ডারও অসীম নয়, আর উনিও নানার কাছ থেকে যা পেয়েছেন তাতে উনার মোটামুটি চলে যেতো।কিন্তু উনি কখনো দুরবস্থায় পড়েননি কারন উনার দুই ছেলেই প্রবাসী।আর তারাই পরিবারকে একটা স্বচ্ছল অবস্থায় নিয়ে আসে।

আর মেজোমামা,উনার নাম সাঁদত খাঁ।উনি চিরকালই বেশ সৌখিন ছিলেন।বেশ কেতাদুরস্তভাবে চলতেন।উনার সবচেয়ে আকর্ষনীয় জিনিস ছিলো উনার শিখদের মত পাকানো গোঁফ।আর উনার রাঁগী চোখগুলো। অনেকটা পাকিস্তানের সাবেক প্রেসিডেন্ট জিয়াউল হকের মত ছিলো উনার লুকিং।আমার মামাতো ভাইয়েরা উনাকে যমের মতো ভয় খেতো।কিন্তু উনি আমাদের অত্যান্ত স্নেহ করতেন।আমার মনে আছে আমরা যদি বেড়াতে যেতাম উনি নৌকা ভর্তি বাজার নিয়ে আসতেন।আপ্যায়ন করতে উনি খুবই ভালোবাসতেন।আমরা বাধ্যতামুলকভাবে তার এখানে থাকতে এবং খেতে হতো।উনি আমাদের কোথাও এমনকি বড় মামার ঘরে থাকাও মেনে নিতেন না।

আমার মামাতো ভাইয়েরা বলতো,জানেন তুহিন ভাই,চোর উঠছিলো আমাদের নারকেল গাছে।আব্বা টের পেয়ে গাছের তলায় গিয়ে রেগে চুরমার হয়ে চোরের দিকে এক ঠায় তাকিয়ে ছিলেন চোখ পাঁকিয়ে আর মোঁচে তা দিচ্ছিলেন ক্ষনে ক্ষনে।চোর যখন চোখাচুখি হলো তখন সে শুধু পাকানো চোখ দেখেই তিনতলা সমান উচু গাছ থেকে পড়ে পা ভেঙ্গে ফেলেছে।

এই আমার বড় দুই মামা।আরো কিছু যদি মনে আসে লিখে রাখবো।না হলে সব একদিন ভুলে যাবো।

আমাদের সেই শহরে।

আমরা যখন ছোট ছিলাম,মানে ৮৩-৮৪ সালের কথা বলতেছি।তখনও পাঙ্কু টাইপ লোকজন ছিলো এখনের মত।তারা অন্যদের থেকে আলাদা থাকতো,একেবারে ফিটফাট আর কি।কাপড়-চোপরের স্টাইলটা সাধারনত দেখা যেতো এক এক বছর খুব চলে তারপর ক্ষ্যামা দিতো।যেমনঃ-সত্তরের দশকে বেলবটম প্যান্টের সাথে বড় কলার শার্টের সাথে তিন ডিগ্রী বাড়া একটা মোঁচ না হলে মর্দামি জিনিসটাই বোঝানো যেতো না।তাই দেখবেন সে আমলের সিনেমাগুলিতেও সেটা প্রতিফলিত হতো।

আচ্ছা মুল কথায় আসি।আমার বদ অভ্যাস আছে এক কথার থেকে আরেক কথায় যাওয়ার।৮৩-৮৪ এর দিকে বেলবটম বাদ হয়ে এখন যেটা স্কিনফিট বলে সেটা ফিরে আসে।সাথে করে নিয়ে আসে চেইন সিসেম বুটজুতা।সেবার ঈদে সেটাই ফ্যাশন।ঈদের দিন দেখা যেতো ঈদের নামাজ না পড়েই ধৈর্যহীন কিছু পোলাপাইন রাস্তাঘাটে আন্দাজি ঘুরে বেড়াচ্ছে।আপসোসের ব্যাপার আমার এক বন্ধুও সেই দলে যোগ দিয়ে ঘুরে বেড়াতো।তারপর নামাজ শেষ হলে দেখা যেতো আসল খেলা।শত শত পাঙ্কু চেইন ওলা বুটজুতা আর স্কিনফিট প্যান্ট পড়ে টিংটিঙ্গা পাছা নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে।সে এক দৃশ্য।এই শো ডাউন শেষে ঈদের মাইনের টাকা তুলে সবাই জামাতের সাথে সিনেমা হলের দিকে দৌড় দিবে।

আর একটা কথা ,সে আমলে মানুষ কিন্তু এমন দামড়া শরীরের অধিকারী হতো না।তখনকার বেশীর ভাগ ফটো দেখলে সত্যতা টের পাবেন।আমাদের বর্তমানের লাইফস্টাইল আর এডিবল ওয়েল আমাদের স্থুলতা বাড়িয়ে দিয়েছে।তখন সবাই এতোই টিংটিঙ্গা হতোযে,পেছনের প্যান্টের পকেটে এক্সট্রা কাগজ মানিব্যাগ রেখে স্কিনফিটে একটা ভাব আনতো।আমাদের রাব্বানি ভাই আর তার বন্ধু বাবুল এরা অফ হোয়াইটের স্কিনফিট জিন্স পড়তো আর সাথে সাদা লেদার সু সাথে হাফ হাতা কালারফুল শার্ট ইন করা।চিন্তা করেন,তাদের কেমন মারাত্বক লাগতো।দুজনেই পিছনের পকেটে গ্যাটিস ভরে পাছাটা টিংটিং করে নাড়তে নাড়তে যখন বনানি কমপ্লেক্সে সিনেমা দেখতে যেতো,তখনি আমরা বলতাম-টেডি রাব্বানি আর ডিফিলিং বাবুইল্যা যায় রে।খুবই ক্ষেপে যেতো।

এই টেডি রাব্বানি ভাইয়ের ঘরেই এলাকার একমাত্র ভিসিয়ার টা ছিলো।যার ফল হতো,টেডি রাব্বানি বললেই কয়েকদিন হিন্দি সিনেমা দেখা বন্ধ হয়ে যেতো।বহুত কিড়া-কসম কেটে সাক্ষী মেনে যে আর কোনদিন এসব বলবো না,তারপর আবার অনুমতি মেলতো।আমরা দল বেধে হিন্দি মুভি দেখতে যেতাম।আমি,রাজেস,আজাদ ,রিপন সবাই হিন্দি একশন মুভির চরম ভক্ত ছিলাম।রজনি কান্তের ছবি আর মারের আমরা মারাত্বক ফ্যান ছিলাম।আবার দূঃখের ছবি দেখে আমাদের লাইভ প্রতিক্রিয়া দেখা যেতো।মর্দ ছবিতে অমিতাভ মার কোল থেকে পড়ে পাহাড় থেকে নিক্ষিপ্ত হওয়ার সময় আমরা সজোরে কেদে ফেলি বলে রাব্বানি ভাই আমাদের বের করে দেয়।আমরা কাদতে কাদতেই একে অপরের দোষ দিতে থাকলাম।

আরেকটা ব্যাপার ছিলো,মুভি দেখতে বসলেই শান্তি মিলতো না।রাব্বানি ভাই প্রতি মুহুর্তে হিন্দির বঙ্গানুবাদ করে আমাদের জীবন ফানাফিল্লাহ বাকিবিল্লাহ বানিয়ে দিতো।এখনের সাব টাইটেল ব্যাপারটা উনি নিষ্ঠার সাথে পালন করতেন।ব্যাপারটা এভাবে ঘটতো,সিনেমা চলছে আর উনি বলতেন,উস নতিজা মানে বুঝছোস এই সিদ্ধান্ত আর কি।মাওয়ালি আওয়ারা মানে তোঁরা আর কি।পাল্কো কি ছাও মে মানে চোখের পলকের ছায়ায়।কিছুই আমরা বলতে পারতাম না,কারন মতের মিল না হলে উনি সাথে সাথে উঠে মেইন সুচ বন্ধ করে বলতো-এখনি বাইর হ।

আর আমরা যার অমতের জন্য সদলবলে বহিষ্কৃত হলাম তাকে পুনরায় আড্ডা থেকে বহিষ্কৃত করতাম।একবার আন্ধা-কানুন সিনেমায় রেপের দৃশ্য এসে পড়ায় উনি যখন গিয়ে ফাস্ট ফরোয়ার্ড করে দিচ্ছিলেন তখনি আমাদের রিপন বলে উঠে-রাব্বানি ভাই আর একটু দেখি না।সাথে সাথে আমাদের ফুল টিম সাস্পেন্ড,একেবারে স্টান্ড রিলিজ।রিপনকে মেইন আসামি হিসেবে কানের লতি ধরে বের করার সময় উনি আরেক হাতে সশব্দে মেইন সুচ বন্ধ করলো।

আর আমরা সিনেমার এই শেষ ক্লাইমেক্সে এসে বহিষ্কৃত হওয়ায় রিপনকে লাঞ্চনা -গঞ্জনায় জর্জরিত করে ফেলি।এমনি ছিলো আমাদের সেই শহর,সেই সময়।

মুসলমানী সমাচার।

আমাদের ছোটবেলায় দেখা যেতো জানুয়ারী ফেব্রুয়ারি মাসেই মুসলমানী বা খত্নার ধুম পড়ে যেতো।আমি জানিনা কারন কি ছিলো।শীতকালে না হয়ে গরমকালে হলেই ব্যাপারটা ভালো হতো।কারন ভুক্তভোগী মাত্রই জানে,শীতে কাঁটাছেড়া দেরীতে শুকায়।তো ব্যাপারটা হলো, দেখা যেতো সেই সময়ে বিহারী হাজেমের দল এলাকাতে এসে যেতো।বগলের নীচে সার্জিক্যাল ইকুইয়েপমেন্ট নিয়ে ছেলেপুলেদের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে অভিভাবকদের খোঁজ করতো।

আমার ও বন্ধু রাজেশের একিই দিন মুসলমানী হয়।রাজেশের মামা ডাক্তার ,উনিই চট্টগ্রাম মেডিকেল এ এক শুক্রবার সকালে আমাদের খত্নাকরন প্রক্রিয়া শেষ করেন।সে বছর আমরা ৫ম থেকে ৬স্ট শ্রেনীতে উঠবো।আব্বা আমাকে একটা ৫০০ টাকার নোট দিলেন।কান্নাজড়িত কন্ঠে বেদনার্ত পরিবেশের মাঝে ভাবগাম্ভীর্য অবস্থায় টাকাটা নিলাম।এটা একটা আশ্চর্য ব্যাপার,জ্ঞান হবার পর থেকে আজ পর্যন্ত একমাত্র টাকা দেখলে আমি রাগ করিনা।টেক্সীতে আসার সময় ক্রন্দনরত অবস্থায় ভাবতে ভাবতে এলাম ভালো হবার পর এ টাকা দিয়ে কি কি করবো।

৪-৫ দিন পর আমার বন্ধুরা হঠাত করে ঠিক করলো,নায়ক রুবেলের কি জানি একটা মারাত্বক ক্যারাডির মুভি আসছে,আরে মনে আসছে।মুভিটির নাম বজ্রমুস্টি,কারন আমাদের সুমন অলরেডি এটা দেখে আসছে যে কিভাবে রুবেল শেষ পর্যন্ত ভিলেনের অন্ডকোষ এ লেম্বুচিপা দিয়ে তাকে মেরে ফেলে।এ কাজটা করার সময় নাকি ইনসেটে একটা কমলা লেবু থাকে,সেখানে দেখায় কিভাবে লেবুটাকে চিপে বরবাদ করে দেয়া হয়।সুমনের প্রানঘাতি বিবরণ শুনে আমরা তা দেখার জন্য বিহবল হয়ে পড়ি।সে সময় রুবেলের ছবি মানেই হিট।কিন্তু গোল বাধালাম আমি।আমি একেবারে চিতকুর মেরে কেঁদে উঠি।তাদের বলি-তোরা আমাকে ছাড়া যেতে পারবি না।আমি ভালো হলে এক সপ্তাহ পর যাবো।কেউ একমত হলো না।সবার কথা হলো,তখন আরেকবার যাওয়া যাবে।আর তুই এখন যে অবস্থায় আছোত,তোর আরো ২ সপ্তাহ লাগবে।

কি আর করা,শেষ পর্যন্ত ঠিক করলাম আমি যাবোই যাবো।তারা বন্ধুর মরনপন ইচছা দেখে রাজি হলো।কিন্তু তারা বললো-তুই লুঙগি পড়ে কিভাবে যাবি?আমি বললাম,আমি যেভাবেই যাই তোদের তো সমস্যা নাই।তোরা আমাকে ঘিরে থাকবি,তাহলেই আমি ব্যথা পাবোনা।আমি লুঙ্গি পড়ে ঐজায়গাতে লুঙগীটা ধরে উপুর করে রাখবো।তোরা খালি খেয়াল রাখবি আমার গায়ে যেনো কোন মানুষ এসে না পড়ে।

সিনেমা হলে গেলাম। দৃশ্যটা শুধু কল্পনা করেন,আমি মাঝে লুঙ্গি আলগি দিয়ে দাঁড়িয়ে আছি আর আমাকে ঘিরে প্রেসিডেন্ট গার্ড রেজিমেন্টের মতো বন্ধুরা। এর মাঝেও একটা ব্যাপার আছে আমাদের বাইট্টা মামুন তখন এতোই ছোট ছিলো যে,আমাদের মায়ন বুদ্ধি দিলো মামুন তুই আমার কোলে লাফ দিয়ে উঠে ঘুমিয়ে থাক।হলে ঢূকলে তোকে নামিয়ে দিবো।তাহলে আমাদের একটা টিকেট কম কিনতে হবে।যথারীতি তাই হলো,দারোয়ান শুধু একবার বললো-এতোবড় বুইড়া পোলা কোলে নিয়ে আসার কি দরকার ছিলো? সিনেমা দেখলাম,কমলা চিপাও দেখলাম।এবার শো ভাংলো,বের হবার পালা।

আমি আবার লুঙগি হাতে নিয়ে আস্তে আস্তে এগিয়ে যাচ্ছি,আমাকে ঘিরে প্রেসিডেন্ট গার্ড রেজিমেন্ট।তখনই গোল বাধলো।অতিরিক্ত জনতার চাপে আমার বাহিনী সইতে না পেরে আমারই গায়ে এসে চাপাচাপি করতে লাগলো।আমি উনার নিরাপত্তায় শংকিত হয়ে চিৎকার শুরু করি-ভাই আমারে বাঁচান,আমার মুসলমানী হইছে।আমার সঙ্গীরা চিৎকার করছে-ভাই আপনারা এভাবে চাইপেন না,ওর মুসলমানি হইছে।সবার কথা তোদের যদি মুসলমানীই হয়,সিনেমায় আসলি কেনো ফাজিলের দল। এখন মর।কিভাবে বেচে ফিরলাম সে আরেক ইতিহাস।

চলমান জীবনের টুকরো কাহিনী-৩

এলাকার ছোট্ট মুদীর দোকান।প্রায় সবই পাওয়া যায়।বাড়তি হিসাবে ছোটদের লাঠিম,ঘুড়ি আর নাটাই ও পাওয়া যায়।সেখানের এক মুহুর্তের একটা বিকিকিনির গল্প এটা।

কতই বা বয়স হবে ছেলেটির,এই ফোর বা ফাইভে হয়তো পড়ে।সে বিক্রেতাকে বললো-একটা ঘুড়ি দেন।বিক্রেতা মোসলেম সেটা দিলেন।ছেলেটা ভালো করে কিউসি করে জানালো,ঘুড়ির কাইম(মাঝের কাঠি) মোটা মোটা লাগে।ঠিকমতো উড়বে তো?মোসলেম জানালো-আংকেল এটা তুমি কি বললা?ঠিকমতো উড়াতে জানলে দুইটা মাইয়া তোমার প্রেমে পড়বে।

ছেলেটির একিই সাথে ধৈর্যচ্যুতি ও উৎকট মশকারা পছন্দ হলো না।সে বললো-দুরু কুত্তার বাচ্চা।মোসলেম তার অসীম ধৈর্য নিয়ে একটা মিচকে হাসি দিলো।
মোসলেম একজন জাত প্রেমিক।শুধু দোকানদারীই তার একমাত্র লক্ষ্য নয়।সে আমাদের নেত্রীদ্বয় থেকেও বেশী আশাবাদী।তার অসংখ্য প্রেমিকাদের সে ভিন্ন ভিন্ন গ্রহে নিয়ে গিয়ে বাসা বাঁধার স্বপ্ন দেখায়।কিভাবে যেনো প্রত্যেককে সে আলাদা আলাদা টাইমে ম্যানেজ করে।এক্ষেত্রে পরিকল্পনামন্ত্রীও তার কাছে ফেল মারবে।

তার হৃদয়ের ব্যাপ্তি নিয়ে কোন ধারনা করা কারো পক্ষে সম্ভব না।আমি আগে বিজ্ঞানীদের সেই কথাটা বিশ্বাস করতাম না।ঐ যে বিজ্ঞানীরা বলেন-আমাদের এই সৌর জগত ছাড়াও মহাবিশ্বে অসংখ্য সৌর জগত আছে।কিন্তু মোসলেমকে দেখার পর এখন আমি উপলদ্ধি করেছি,আছে অসংখ্য সৌর জগতের অস্থিত্ব আছে এই মহাবিশ্বে।

খুচরো আড্ডা।

আমাদের বন্ধু শাহীন ও সুমন দুজনেরই বাড়ি মীরসরাই হওয়ার পরও তাদের মধ্যে বিন্দুমাত্র মিল-মহব্বত নেই।এরা একজন আরেকজনকে নাম বিকৃত করে ডাকে।যেমনঃ- সুমনের বাড়ি করের হাট মীরসরাইয়ের পুবদিকে,তাই শাহীন বলে বেড়ায় -আমাদের পুবদিকে পাহাড় সেখানে কোন ভদ্রলোক থাকে না।একমাত্র ওবায়েদ বলী বলে এক লোক সেদিকে থাকতো সেই যা কিছু পরিচিত।তাও আবার খালী বলী খেলতো।তাই সুমনকে সে বলতো,হুব কুইল্লা মাগির হুত(পুবদিকের _ _ _ পুত)।

আর শাহীন কালো হওয়াতে সুমন বলতো,ওদের দেশে কাজ করার লোকগুলো বা মুনীষ গুলো অনেকটা এই শাহীনের মতোই দেখতে।কালো বলিস্ট এই কুলীদের তারা নাকি কাদিরা বলে(এদের কোন আলাদা নামে ডাকতে মুখ খরচ করতে নাকি সময় বাঁচে,তাই কাদিরা নাম,এটা ডাকাও সহজ।

তাই আড্ডায় আসলেই শাহীন বলে,হুব কুইল্লা মাগির হুত কোনাই?(সে কোথায়)

আর সুমন আসলে বলে,কাদিরা এবো আইয়ে নো?(কাদিরা এখনো আসেনি)

আর সুমনের নামের সাথে চৌধুরী শাহীন কোনমতে মানতে নারাজ,তার কথা পুবদিকে কেমনে চৌধুরী নাম থাকে?এগুলা তো শুধু আমাদের নিজামপুর এলাকায় আছে।আমরা মোঘলদের আমলের লোক।শাহ সুজা আমাদের এখানে দিয়ে বার্মা গেছে।নিজামপুর পরগনা ঐতিহাসিক জায়গা।আমাদের এদিকে আছে পরাগল খাঁ দিঘী,ছুটি খাঁ দিঘী,ছদর মা দিঘী।এগুলো সব ঐতিহাসিক এলাকা।পাহাড়ি গুলা এগুলার কি মুল্য
বুঝবে?ওবায়েদ বলীর দেশের লোক বলী খেলা ছাড়া আর কি বাল বুঝবে?

তো সেইদিন শাহীনের খালি ঘরে আমরা সবাই আড্ডা দিচ্ছিলাম।আম,কাঠাল,জাম,লিচু কেনা নিয়ে কথা হচ্ছিলো।শাহীন একটু গাল-গপ্প বেশীই মারে,সে বলছে আরে আমি তোরার মতো ২কেজি ৫কেজি আম কিনিনা।আমি কিনলে এক পেটী আম কিনি।কে বার বার বাজারে যায়।

সাথে সাথে সুমন বসা থেকে লাফ দিয়ে উঠে শাহীনের রান্নাঘরের জানালা দিয়ে নিচের দিকে ভালো করে কি জানি দেখলো।আবার সেখান থেকে ফিরে সামনের বারান্দার গ্রিলের নিচে সানসেট দেখে এসে বললো-এরে চু-----র পুত।গালের পর গাল যে হিডোর,ফেডি ফেডি আম বলে খাই হালাছ,কই আই তো তোর রান্দাঘর আর বারান্দার সামনের নিচে সানসেটে অউজ্ঞা আমের ছোলকা আর বড়াও হড়ি থাইকতে দেইকলাম না।হেতে আর বালের হুরুট(ফ্রুট) খায়।

ভয়ানক মারপিট হয়েছিলো।থামাতে বেশ পরিশ্রম হয়েছে।

একটি নিস্পাপ ভুতের গল্প।

আমরা যখন টু বা থ্রি তে পড়ি,আমাদেরও ভুতের গল্প দারুন প্রিয় ছিলো।সন্ধ্যের পর মাঠের এককোনে ধুনি জ্বালিয়ে ঘাপটি মেরে বসে শুরু
হতো ভুতের গল্প।আমাদের ভুতের গল্পগুলো স্বাভাবিকভাবেই আমাদের বয়স উপযোগী ছিলো(পরে আমরা বড় হয়ে দেখলাম,হলিউডের অনেক হরর মুভিতে যৌনদৃশ্য ছিলো)।আমাদের প্রায় গল্পেই থাকতো,কার ছাদে রাতে কি শোনা যায় বা কে ভরদুপুরে ছাদে উঠে কি দেখেছে,এসব।

কিন্তু আমাদের এই নির্ঝঞ্জাট নিস্পাপ ভুতের গল্পে যৌনতা নিয়ে এলো আমাদের বন্ধু কখগ(ছদ্মনাম,আসল নাম দিলে সমস্যা আছে)।তার প্রায় ভুতের গল্পেই দেখা যেত,পরী এসে কিভাবে সুন্দর ছেলে তুলে নিয়ে পড়ে ফেরত দেয়।তার আলিফ লায়লা বয়ান।তারপর সে একদিন বললো,তার বাড়ির পাশে পাহাড় থেকে কিভাবে এক ভুত এসে তাদের গ্রামের এক মহিলাকে তুলে নিয়ে যায়।পরে ফেরত দেয়।কিন্তু পরে এই মহিলার বাচ্চা হলে দেখা গেলো সেগুলোর রঙ নীল।আমরা যখন অবিশ্বাস করলাম,কখগ তার কয়েকজন আত্নীয়ের নাম করে বললো,ওরা আমাদের এখানে বেড়াতে এলে জিজ্ঞেস করিস।

তার প্রায় গল্পই ছিলো তুলে নিয়ে যাওয়া।ভুত তুলে নিয়ে যাওয়া ছাড়া আর একটি গল্পই সে বলেছে,কিন্তু সেটাও দেখা গেলো তুলে নিয়ে যাওয়া সংক্রান্ত।সেটা হলো-কবে নাকি অঞ্জু ঘোষ রাঙ্গামাটিতে শুটিং এ গিয়েছিলো,কিন্তু শান্তিবাহিনী তাকে তুলে নিয়ে যায়।অবশ্য পড়ে নাকি ফেরতও দেয়।কখগ বলেছিলো-বুঝস তো পড়ে ফেরত দেয়া মানে কি?আমরা বুঝেও না বুঝার ভান করে বলতাম-ভাই,বুঝি নাই,একটু বুঝিয়ে বল।

তো হলো কি,তার অনেকদিন পর যখন কখগ বড় হলো,একরাতে সে শরীরের জ্বালায় টিঁকতে না পেরে কদমতলী রেললাইনের কাছে যায়।কিন্তু অবুঝ পুলিশ তাকে সেখান থেকে ব্যস্ত থাকা অবস্থায় তুলে নিয়ে যায়।

সম্রাট আকবর ও মুসলমানী প্রসঙ্গ।

ইতিহাসের এইদিনে এই ভ্যালেন্টাইন ডে তে ১৪ ফেব্রুয়ারী,১৫৫৬ খ্রীঃ সম্রাট আকবর ১৪ বছর বয়সে দিল্লীর সিংহাসনে আসীন হন। ভ্যালেন্টাইন ডে তে সম্র...