বুধবার, ১৭ জুলাই, ২০১৩

আমাদের সেহেরী পার্টি।

সবাই ইফতার পার্টি করে,কিন্তু ৯৮-৯৯ সালের দিকে আমরা বন্ধুরা করতাম সেহেরী পার্টি।রাত ১০টার পর ছাদে উঠে আমাদের তোড়জোড় শুরু হতো।বেশীর ভাগ সময়েই আমরা আখনি বিরিয়ানি রান্না করতাম।সাথে কোক-পেপ্সি আর সালাদ আইটেম।রান্নার কাজে আবদুল্লাহ ব্যস্ত থাকতো,সাথে সাহায্যকারী থাকতো।আর আমরা আড্ডার পার্টির দঙ্গলটা ছাদের উপর জলছাদ যেটা আছে তার উপর বিরাট জ্ঞান-গর্ভ আলাপে মশগুল থাকতাম।

আমাদের ইমরান(ওকে আমরা গুলাম বলি,ও ব্রাহ্মনবাড়িয়ার,তাই ক্ষুধারে বলে ভুক,কোক রে বলে কুক,ঢোল রে বলে ঢুল) আমাদেরে সুফীবাদ বুঝাইতে চাইতো।ওর আবার যেটাতেই ঝুকে,প্রথমদিকে ঝঁঝবা এসে যায়।খুব মারফতি গান গায়।তারপরই নেশা ছুটে গেলে আগের কাজকর্মের প্রতি তীব্র বিদ্বেষ ভর করে।একবার সে তাবলিগে যেয়ে ঝঁঝবা এসে যাওয়ায় খুব চোখে সুরমা দেয়া শুরু করলো।এমন মোটা করে সুরমা দিতো,আমি প্রায় বলতাম -তোর চোখের কাছে কিন্তু ম্যাচ নিস না,বারুদে আগুন ধরে যাবে।তো আসল কথা বলি,সে তাবলিগে যেয়ে কোন এক মুরুব্বীর সাথে রাতে ঘুমায়।তারপর কি হয় জানি না,সে পরেরদিনই সেখান থেকে রেগেমেগে চলে আসে।ঐ মুরুব্বির নাম উঠলেই গালাগালি করে।

ওর প্রিয়গান ছিলো-দিন দুনিয়ার মালিক খোদা দিল কি দয়া হয়না।সে প্রচন্ড আবেগ নিয়ে যতবার আমাদের গানটা শোনাতে চায়।আমরা ততবার হেসে উঠি।গুলামের রক্তচক্ষু আমার এখনো মনে ভাসছে। মাঝরাতে মাবু "ডিল কি ডয়া হয়না" বলে অন্তরা ধরাতে গুলাম ইমরান ভয়ানক ক্ষেপে উঠেছিলো?

শনিবার, ১৩ জুলাই, ২০১৩

বাবার কাছে ছোট্ট মেয়েটির অনুরোধ।

আরেফিন সাহেব আজকেও রাত ৪টা করে বাসায় আসলেন।ওনার স্ত্রী আর এখন ওনার জন্য অপেক্ষায় জেগে থাকেন না।ওনার কাছে অতিরিক্ত ১সেট চাবি থাকে,তাই তিনি প্রায় নিশব্দে বাসায় প্রবেশ করেন।বিয়ের পর এ নিয়ে প্রথম প্রথম বেশ সমস্যা হতো,কতো মনমালিন্য,কতো রাগ-অভিমান,এখন তার স্ত্রী মিলির কাছে এটা গা সওয়া হয়ে গিয়েছে।বলা যায় মানতে বাধ্য হয়েছেন।

বস্তুত পুলিশে চাকরীতে প্রবেশের পর থেকেই তিনি একরকম পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পরেছেন।কোনখান দিয়ে ঈদ পার্বন গুলো আসে তিনি তা টেরই পান না,কেননা আজ বারো বছরের চাকুরীজীবনে তিনি খুব কমই ছুটি পেয়েছেন ঈদের দিনে।আমাদের দেশে ঈদের দিনেও প্রচুর হাঙ্গামা হয়,দেখা যায় সমগ্র দেশ যখন ঈদের আনন্দে মগ্ন তখন ও রাস্তায় টহল দিচ্ছে পুলিশ।অথচ তাদেরও যে পরিবার পরিজন আছে কে তার খোঁজ রাখে।

আজকে সারাটা দিন তার অসম্ভব ব্যস্ততায় কেটেছে,রাতের ১০টায় বাসায় আসার পথে আবার কন্ট্রোল রুম থেকে মেসেজ।বাসায় ফিরার সময় ক্লান্তিতে তার শরীর ভেঙ্গে আসছিলো,বাইরে এর মধ্যেই হাল্কা বৃস্টি।তিনি আগত দিনটির চিন্তায় মগ্ন।তিনি নীরবে ঘরে প্রবেশ করে জামাকাপড় বদলালেন।টেবিলে খাবারগুলো ঢেকে রাখা হয়েছে,প্রায় নিঃশব্দে আহারপর্ব সারলেন।এরপর তিনি টিভি দেখতে আসলেন,লো ভলিউমে তিনি খবর দেখতে লাগলেন।সব একি রকম সংবাদ খুন,ছিনতাই,নিরুদ্দেশ এগুলো ছাড়া যেনো আর কোন খবর নাই।

দেখতে দেখতে একটি খবরে উনি মননিবেশ করলেন,উনারই থানার খবর দেখাচ্ছে।এক ভদ্রমহিলা কান্নাকাটি করছে,তার মেয়ে দুদিন ধরে নিখোজ,তাই তিনি সাংবাদিকদের বলছেন এরা পর্যাপ্ত অনুসন্ধান চালাচ্ছেনা,বরং বলছেন দেখেন কোথায় কার সাথে ভেগেছে?

হঠাত পিছনে খুট করে শব্দ শুনে তাকিয়ে দেখলেন তার ৬বছর বয়সি মেয়ে রুপন্তি চোখ কচলাতে কচলাতে এসে দাঁড়িয়ে আছে।একি আম্মু তুমি ঘুমাওনি?আব্বু তুমি কখন আসছো,আমার জন্য রংপেন্সিল আনছো?
না আম্মু আজকে আনবো।
আব্বু টিভিতে উনি কান্না করতেসে,ওনার মেয়ে কোথায় গেছে?
আমি জানিনা মা।
ওকি একেবারে হাড়িয়ে গেছে,আর পাওয়া যাবেনা?
না মা অবশ্যই পাওয়া যাবে।
আব্বু তুমি তাকে খুজে দাও?
না মা অন্যরা আছে,তাকে খুজছে?আমি মা খুব ক্লান্ত।
তার মুখটা ম্লান হয়ে গেল।
আব্বু আল্লাহ কি সব দেখতে পান?হ্যা মা।
আল্লাহ কি বাচ্ছাদের খুব ভালোবাসেন?হ্যা মা।
তা হলে আব্বু তিনি যাদের ভালোবাসেন তাদেরকে কি হারিয়ে যেতে দিতে পারেন,তিনি তো জানেন তারা কোথায় আছেন?

আব্বু আমি হারিয়ে গেলে তুমি কি আমাকে খুজবে না?

আরেফিন সাহেব প্রচন্ড ধাক্কা খেলেন,তাকিয়ে দেখলেন তার ছোট্ট মেয়েটি অসহায়ভাবে তার দিকে তাকিয়ে রয়েছে।তিনি মেয়েকে জড়িয়ে ধরলেন।তুমি কোথাও হারাবেনা মামনি,আমি তোমাকে অনেক ভালোবাসি।

আমি মা এখনই ঐ দুস্ট মেয়েটাকে তার মার কাছে খুজে দিয়ে আসবো।তুমি মা একটুও চিন্তা করো না।
তিনি দ্রুত প্রস্তুত হয়ে রওয়ানা হওয়ার সময় তার স্ত্রী এলেন।কোথায় যাচ্ছো,তোমার কি শরীর খারাপ?তোমাকে এমন দেখাচ্ছে কেন?

আমার আম্মু আজ আমাকে একটা ডিউটি দিয়েছে,কাজ টা আগে করে আসি,তারপর তোমাকে রিপোর্ট করবো।

তারপর সারাদিন অনেক খোজাখুজী,সোর্সের উপর কন্টিনিউ চাপ,হারানো মেয়েটির বন্ধুবান্ধব্দের খোজ,তারা কি করে,কোথায় যায়,মা বাবার কাছে পর্যাপ্ত তথ্য, সন্ধ্যার মধ্যেই খোজ মিললো।ঘটনা গতানুগতিক মেয়েটি ব্রোকেন ফ্যামিলির,তার বাবা-মা ৫বছর হলো ডিভোর্সী,সে তার বখাটে বন্ধুবান্ধব্দের পাল্লায় পরে ড্রাগ এডিক্টেড।নেশাগ্রস্ত এক বন্ধুর সাথেই সে নেশাপল্লীর এক জঘন্য বস্তিতে ছিলো,ভাবতেই আরেফিন সাহেব ভীমড়ি খান,এই মেয়ে এখানে আসলো কি ভাবে?তার উপর মেয়ে কোনমতেই বাসায় ফেরত যাবে না।

হায় রে শহরটা কোন দিকে যাচ্ছে?
অনেক বুঝিয়ে তার বাবা মা যে তাকে কত ভালোবাসে,তাদেরকে হাজির করে তারপর তাকে পাঠানো হয়েছে।এইফাকে তার বাবা-মাকে তিনি এটাও বললেন,এটি একটি সাময়িক ব্যবস্থা।তারাই পারেন তাদের মেয়েকে একটি সুস্থ জীবন দিতে।

অতপর বাসায় ফিরা!

অদ্ভুত যে রুপন্তি তারই প্রতীক্ষায় ছিলো।তিনি যখন বললেন মা দুস্টটাকে তার বাবা মায়ের কাছে দিয়ে এসেছি।

রুপন্তি তাকে স্মিত হাসি উপহার দিলো।

আরেফিন সাহেব তার এইটুকু চাকুরীজীবনে আর কখনই এতো তৃপ্তি পান নি,যেটুকু আজ পেলেন।

ভালোবাসার রকমফের।

অবশেষে বিয়েটা হয়েই গেল।বস্তুত পৃথিবীতে কতরকম ঘটনাই না ঘটে একিই সময়ে।প্রায়ই যেটা দেখা যায় হয় যুগলদ্বয় একে অন্যকে ভালবেসে বিয়ে করে,না হলে অভিভাবকেরা পছন্দ অনুযায়ী ফরম্যালি বিয়ে ঠিক করে।কিন্তু মাঝে মাঝে এর ব্যত্যয় ও ঘটে।পাত্রপাত্রী কেউ কাউকে ভালো না বেসেও এর শিকার হতে পারেন।

এমন হয় না যে,নায়ক সব সময় ভেবে এসেছে সে রাজকন্যা না হোক স্নিগ্ধ শ্যামলা বরন এক মেয়েকে বিয়ে করবে।এরপর গেলো সে কক্সবাজার কি বান্দরবনের পাহাড়ে, সুনিল সাগরের পাড়ে দাঁড়িয়ে বা সুউচ্চ সবুজ পাহাড়ে দাঁড়িয়ে সে যখন প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যে মুগ্ধ,তখনি হয়তো সামনে দিয়ে হেটে গেলো কোন সাধারন চেহারার মেয়ে তার এলোকেশী চুলগুলো উড়িয়ে বা তার বড় বড় ডাগর চোখদুটো মেলে ।সাথে সাথে মনে ভয়ঙ্কর প্রেম এসে বাসা বাধলো।প্রকৃতির প্রভাবেই হোক বা নিজের দৃস্টিবিভ্রমেই হোক সম্পর্ক গড়িয়ে প্রেম হয়ে বিয়েতে গড়ালো।

কয়দিন পরেই মোহ কাটার পর ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা,সাগর আর পাহাড়ের নাম শুনলে মা বাপ তুলে গালাগাল।এই দেখো আমি আসল কথা না বলে কিসব বলাবলি করছি।ইদানিং আমার যে কি হয়েছে অতিরিক্ত কথা বলি।

মাঝে মাঝে মানুষ বাধ্য হয়ে বিয়ের পিড়িতে বসে।এ গল্পের নায়ক নায়িকার তাই হয়েছিলো।নায়িকার ক্ষেত্রে একটি দুঃখজনক ঘটনা ঘটে,সম্প্রতি তার বড় বোন দুটি বাচ্চা রেখে অকালে মারা যায়।এখন তার ভগ্নিপতী নায়িকার বাবা মাকে প্রচুর মানসিক চাপ দেয় যে,যদি শ্যালিকাকে এসময় বিয়ে দেয়া হয় তার কাছে তা হলে বাচ্চারা আর সৎ মা পে্লোনা,খালাই তাদের নিজ সন্তানের মত মানূষ করতে পারবে।তার পরিবারের লোক এ ব্যাপারে নিয়মিত চাপ দিয়ে যাচ্ছে।

নায়িকার বয়স হল ১৯,তার ভগ্নিপতির ৪৬।তদুপরি ভদ্রলোকের মাথায় টাঁক,দাড়ীতে মেহেদী।এ অবস্থায় পুরো পরিবার কিংকর্তব্যবিমূঢ়।কন্যার মৃতুয়শোক,বর্তমান পরিস্থিতি সব মিলিয়ে কঠিন অবস্থা।এবার নায়ক।

নায়ক আছে আরেক বিপদে।তার বর্তমান চাকুরীতে সে কঠিন অবস্থায় আছে।বাড়ীতে তার মা একাই থাকেন।সমস্ত আত্নীয়স্বজন তাকে চাপ দিচ্ছে বিয়ের জন্য।কেউ কেউ তার পুরুষত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।যে আজকাল যেখানে রিক্সাওলাও ৩-৪টা বিয়ে করে সেখানে তার সমস্যা কি,যেখানে তারা আর্থিকভাবে মোটামোটি স্বচ্ছল।

নায়কের আবার একটি গুন হলো তিনি বেশ আড্ডাবাজ।পাড়াই যত মুরুব্বী আছে সবাই তার রাজনৈতিক বন্ধু।সমবয়স্কদের থেকে বরং এদের সাথেই তার সখ্যতা বেশি।ইদানিং তার মন খারাপ কারন কাকা এখন আড্ডায় অনিয়মিত,তার বড় মেয়ে অকালে মারা গেছে।কাকার দুঃখে সেও সমব্যথী।আজ সে ঠিক করল কাকাকে দেখতে যাবে।

বেল বাজার পর দরজা খুললো একটি স্নিগ্ধ চেহারার মেয়ে।

কাকা আছে?

হু।মেয়েটির চোখের নিচে শুকিয়ে যাওয়া কান্নার দাগ,বোনের শোকে সে মুহ্যমান।

স্লামালেকুম কাকা।আসো বাবা,আসো।

নিরবতা।নায়ক কি সান্তনা দিবে ভেবে পায় না।

কাকা আজ আসি,আবার আসবো।ঠিক আছে বাবা,তুমি বাবা কিছু চা-নাস্তা খাও।না কাকা আরেকদিন।

আড্ডাতে আরেক কাকা তাকে বললেন,কাকার বর্তমান সমস্যা নিয়ে।জামাতার চাপে উনি মানসিক চাপে আছেন।

নায়ক নায়িকার চেহারাটা কল্পনা করলো,না মেয়েটি তো বেশ।নায়ক নিজেও আছে বেজায় পারিবারিক চাপে।এক কাজ করলে কেমন হয়,কাকা কি তার কাছে মেয়েটিকে বিয়ে দিবে।এটাতো সতিয়্য কাকা তাকে বেশ পছন্দ করেন,কিন্তু কাকার মেয়েটি?

যথারীতি প্রস্তাব দেয়া হলো।কাকা ভীষন খুশী হলেন,তাকে তিনি নিজে অনেক দোয়া করলেন।এ ছোট্ট মেয়েটি তার ভীষন পছন্দের।বিয়ে দ্রুত এগিয়ে আসলো।নায়ক যেমন পরিস্থিতির চাপে সুবিধাবাদীর মতো বিয়েতে রাজি হয়েছিলো,তেমনি নায়িকাও সুবিধাবাদীর মত রাজি হয়েছিলো ভগ্নিপতির প্রস্তাব থেকে বাচার জন্য।অতঃপর দুই সুবিধাবাদীর বিয়ে হয়ে গেলো।যারা একে অপরের প্রতি মোটেও প্রেমে পড়েনি।

দুই সুবিধাবাদীর মধ্যে বিয়ে হলে যা যা হয় তা একসময় ফুটে বেরোতে লাগলো।এরা একে অপরের খুব দোষ ধরতো।কিন্তু পৃথিবীটা বড়ই বিচিত্র।দেখা গেলো এরা যত মান অভিমানই করুক ,দুজন দুজনকে ছাড়া এরা বেশিদিন থাকতে পারতো না,আবার অনুভবের এই ব্যাপারটা কেউই কারো কাছে ফাঁস করতো না।একপক্ষ সন্দেহ করতো বিপরীত পক্ষ এটা বুঝতে পারলে অতিরিক্ত দাম দেখাবে।সুতরাং কোন দূর্বলতা নয়।

এভাবেই তাদের জীবন চলতে লাগলো।আর জীবন ও সম্ভবত সবকিছুর সাথে নিজেকে মানিয়ে নিতে বাধ্য।আর মুরুব্বীরাও বলে দীর্ঘদিন একত্রে থাকলে নাকি স্বামী-স্ত্রীর চেহারাতেও একটা মিল মিল ভাব দেখা যায়।

পুনশচঃ নায়ক নায়িকাকে একটি বৈশাখি শাড়ি উপহার দিয়েছে,তারা নাকি আবার পহেলা বৈশাখে ঘুরতেও বের হবে।পৃথিবীটা কতই না বিচিত্র!

নিজামী গঞ্জোভীঃআজারবাইজানের মহাকবি ও লাইলি-মজনু মহাকাব্যের রচয়িতা।

নিজামী ছিল এ মহাকবির ছদ্বনাম,তিনি নিজে এ নামে পরিচিত হতেন।আর প্রকৃত নামটি বড়ই জমকালো,পারস্য সাহিত্যের এই মহাকবির পুরো নাম ছিল নিজাম আদ দীন আবু মুহম্মদ ইলিয়াস ইবনে ইউসুফ ইবনে জাকী।তথাপি কবি বড়ই নিরঅহংকার ও সরল ছিলেন।

তিনি জন্মেছেন আজারবাইজানের গাঞ্জেচাই নদীর তীরে ঐতিহাসিক গাঞ্জে নগরীতে ১১৪১খ্রিঃ এবং মৃত্যুবরন করেন একই নগরীতে ১২০৯খ্রিঃ।যদিও জীবনের অধিকাংশ সময় কাটিয়েছেন দক্ষিন ককেসাসে।তার মা ছিলো কুর্দী,নাম রাইসা আর বাবার নাম ছিলো ইউসুফ,আর দাদার নাম ছিল জাকী।ধারনা করা হয় তার পুর্বপুরুষ ইরানের কোম নগরী থেকে আগত।

পারসিক মহাকাব্যে তার কবির লড়াই বা কথোপকথনের কবিতার লড়াই ও বাস্তবধর্মী কবিতাগুলো আজারবাইজান,ইরান,আফগানিস্তান থেকে তাজিকিস্তান পর্যন্ত বিদগ্ধ লোকদের মুখে মুখে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।

ছোট থাকতেই পিতৃহারা নিজামী মামার তথ্বাবধানে বড় হয়ে উঠেন,তার মামা তাকে উপযুক্ত শিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলেন।তিনি শুধু ফার্সিতেই নন আরবীতেও সমান দক্ষ ছিলেন।এছাড়া তার মেধায় উত্তরাধিকার সুত্রে তার বাবা ও দাদার জ্ঞানের বহিপ্রকাশ ঘটেছিলো।তাই তার কাব্যে গনিত,জৌতিবিদ্যা,রসায়ন,উদ্ভিত তথ্যের সন্মিলন দেখা যায়।

বড় অস্থির এক যুগে তার আগমন,রক্তান্ধ রাজারা তখন দেশের পর দেশ ধবংশ করছিলো।কিন্তু তারপরো কবিকে বিলাশিতার লোভ দেখিয়ে কেনা সম্ভব হয় নি।গালিচার বদলে ছেড়া কাথায় বসে থেকেছেন,রত্নরাজির বদলে তার ছিলো অগুনতি বই।এরপর কত রাজার গালিচা পোকায় কেটেছে,রাজপ্রাসাদ ভেঙ্গে পড়েছে কিন্তু তার কাব্য ছিলো অমর ও অজেয়।কবি জানতেন যে দুনিয়াকে এগিয়ে দেয় নিশংস জল্লাদেরা নয়,এগিয়ে দেয় ভালো লোকেরা।তাই তিনি ছিলেন মানবতার কবি,প্রেমের কবি।

তার গীতি কবিতায় তিনি বর্ননা দেন,সাসানিদের রাজা আনুশিরভান একবার শিকারের নেশায় অনুচরদের ফেলে অনেকটা এগিয়ে যান,সাথে থাকে শুধু তার এক উজির।দুজনে এসে পৌছলেন ছারখার হওয়া এক গ্রামে।চারোদিক খা খা করছে,সমস্ত বাড়িঘর বিধবংশ,কোথাও কোন জীবিত লোক নেই।কেবল ভাঙ্গা বাড়ির দেয়ালে দুই বিকট দর্শন পেঁচা কি যেনো বলাবলি করছে।পেঁচাদের এই উচ্চকন্ঠে এই ডাক শুনে ভীত রাজা উজিরকে বললেন ওরা কি বলছে?কারন উজির আবার পাখির ভাষা বুঝতেন।উজির শুনে বললেন,এক পেঁচা আরেক পেঁচার কাছে মেয়ের বিয়েতে যৌতুক হিসাবে এরকম নরকের ন্যায় আরেকটি গ্রাম চাচ্ছে।তখন অন্য পেঁচাটি বলছে,কোন চিন্তা নেই,আনুশিরভান যতদিন বেচে আছে ততদিন এরকম আরো হাজার হাজার নরকের ন্যায় গ্রাম ও পাওয়া যাবে আর লোকেরাও তার ফকির ও গোলাম হয়ে থাকবে।নিজামী সক্রোধে লিখেছিলেন,চুপ কর রে নিজামী,গল্প গেলো ছিড়ে,কলজে তোর অনেক দিনই রক্ত ঝরো ঝরো।

তেমনি লাইলী-মজনু গীতিকবিতায় তার প্রতিভার সেরা বিকাশ দেখা যায়।আরেক কবি সাদী এর সুন্দর বর্ননা দেন-লাইলীর রুপের বর্ননা শুনে রাজা আগ্রহী হোন তাকে দেখতে।কিন্তু দেখার পর রাজা মন্তব্য করেন,এই তার সৌন্দর্য,আমার হেরেমের সবচেয়ে খারাপ বাঁদীও তো এর চেয়ে সুন্দর।নিজামী এ ক্ষেত্রে বলেন,যে যায় বলুক লাইলীকে দেখতে হবে মজনুর প্রেমকাতর চোখ দিয়ে,তবেই না তার সৌন্দর্য বুঝা যাবে।
লিখতে গেলে আরো অনেক কথা লেখা হয়ে যাবে।তাই তার সেরা গীতিকাব্যগুলোর নাম দিলামঃসাসানিদের রাজা খসরু ও আর্মেনিয়ার রাজকন্যা শিরিনকে নিয়ে তার একটি কাব্যগ্রন্থ আছে খসরু ও শিরিন নামে।

এছাড়া লাইলী ও মজনু,এস্কান্দর নামা,হাফত পায়কর বা বাহরামনামা বা সপ্ত সৌন্দর্যও তার অনন্য কীর্তি।

তবে তার সবচেয়ে বিখ্যাত গীতিকাব্য হলো পাঞ্জ গাঞ্জ বা পঞ্চ রত্ন।

একাত্তরের মা।

সেই জুন মাসে মার সাথে মইনের শেষ দেখা হয়,তাদের দলটি আগরতলায় যাওয়ার আগে সবাই যার যার পরিবারের সাথে দেখা করতে এসেছিলো।মা মইনকে কোন বাধাই দেয়নি।কারন তিনি তো দেখেছেন,তিনি ছেলেকে আঁচলের তলে রাখলেই বাঁচাতে পারবেন না।

পাকসেনাদের কাছে যুবক ছেলে মানেই হল নির্ঘাত মুক্তিবাহিনী।তাই তিনি কোন বাধা দেননি।কিন্তু মার মন বলে কথা।তার দুই ছেলের মধ্যে ছোট ছেলে বাবু ভীষন ডাকাবুকো,বলতে গেলে সে তার বয়সীদের কাছে মুর্তিমান আতঙ্ক।কিন্তু মইন ছেলেবেলা থেকে ভীষন লাজুক,তার চোখে চশমা থাকার দরুন সে তার বন্ধুদের কাছে অবহেলার পাত্র।তার স্বাস্থ্য তেমন ভালো না।মা এটি নিয়েই বেশি চিন্তিত।মার মনে পড়ে বাইরে কোথাও অন্যদের কাছে নির্যাতিত হলে মইন ঘরে এসে নীরবে কাঁদত।

মনে পড়ে একবার মইন তার কোন এক বন্ধুকে রক্ত দেয় ১ ব্যাগ।বাড়ী ফিরে মাকে গর্বের সাথে এ কথা বলার সাথে সাথে মা কিরুপ আঘাত পায়।মা কান্নার মাঝে তাকে বলে,তোর নিজের শরীরেই তো কিছু নাই,তুই কেনো দিলি,তোর কি রক্ত বেশী হয়ে গেছে,তোর গা বেঁয়ে বেঁয়ে কি রক্ত পরে।এতো দূঃখের মাঝে ও মার আজ সে কথা মনে হয়ে হাসি পায়।

সেই ছেলে আজ ৪মাস ধরে ঘর ছাড়া।ইদানিং পাড়ার রাজাকাররা এসে প্রায় জিজ্ঞেস করে তার বড় ছেলেকে কেনো দেখা যায়না।তিনি বুঝতে পারেন তাকে অন্তত বাবুকে বাচাতে হলেও শহর ছাড়া দরকার।

অক্টোবরের এই শেষ দিকে এসে শীতটাও আগাম নেমে গেছে।মা আর ধৈর্য্য ধরতে পারলেন না।তিনি শহরের মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে খবর পেলেন মইন মেঘালয়ের দক্ষিনে নেত্রকোনা সীমান্তে পাকসেনাদের সাথে যুদ্ধ নিয়োজিত।যতটুকু খবর পাওয়া যায় সেখানে যুদ্ধ পরিস্থিতি বেশ জটিল।কেননা পাকবাহিনী মিত্রবাহিনীর চালটি ধরে ফেলেছে যে,মুক্তিযোদ্ধারা মিত্রবাহিনী নিয়ে নেত্রকোনা হয়ে ময়মন্সিং পার হয়ে ঢাকার উত্তর অঞ্চল বিশেষ করে গাজীপুরে পৌছতে চায় যাতে ভৈরববাজার হয়ে মুক্তিবাহিনীরা নরসিংদী পৌছে গেলে একটা শক্ত বেস্টনীর ভেতর ঢাকাকে ঘিরে ফেলা যায়।তাই যুদ্ধও একটা চুড়ান্ত অবস্থার দিকে যাচ্ছিলো।

নেত্রকোনায় ভারতীয় গুর্খা ডিভিসন যুদ্ধে নেমে পাকবাহিনীর হাতে বিপুল ক্ষতির সন্মুখিন হয়,ফলে তারা আর এগুতে পারেনি।ফলে মুক্তিবাহিনিকেই আবার গেরিলা আক্রমন চালানোর নির্দেশ দেওয়া হয়,এবং দেখা যাচ্ছে বিপুল ক্ষতির বিনিময়ে হলেও মুক্তিযোদ্ধারা প্রতিরোধ ভাংতে পারছে।

অনেক বাধাবিঘ্ন পেড়িয়ে মা নেত্রকোনা সীমান্তে ফ্রন্টলাইনে এসে উপস্থিত হলেন বাবুকে নিয়ে।চারোদিকে প্রচন্ড গোলাবর্ষন চলছে।সবাই দারুন ব্যস্ত,আহতরা ফেরত আসছে।একজন সৈনিককে মা জিজ্ঞেস করলেন,এখানে মইন বলে কেউ আছে?সে দারুন বিরক্ত হলো,আপনি এই গোলাগুলির মধ্যে কিভাবে আস্লেন,আপনার কি প্রানের মায়া নাই।মা একরোখাভাবে আবার জিজ্ঞেস করলো,আমি আমার ছেলের সাথে দেখা করবো,তাকে আমার অনেক দরকার।

দুরথেকে আরেক মুক্তিসেনা এগিয়ে আসলো,বললো আপনি কি চশমা পরা মইনকে খুজছেন,রোগা করে।মা ব্যাকুল হয়ে তাকে বললো,হ্যা বাবা।তুমি কি তাকে চেনো?
তাকে কে না চেনে?
বাবা তুমি আমাকে বলো,সে কেমন আছে?খালাম্মা সে ভালো আছে।ঐ দূরে যেখানে প্রচন্ড গোলাবর্ষন চলছে সে সেখানে যুদ্ধ করছে।

মা সেদিকে অনেকক্ষন তাকিয়ে থাকলো অশ্রুসিত্ত চোখে,গভীর আবেগে জিজ্ঞেস করলো,আচ্ছা মইন কি যুদ্ধে ভয় পায়,সেকি গুলি করতে পারে?

সৈনিক ক্ষুদ্ধ কন্ঠে উত্তর দেয়,মইন আমাদের সেরা যোদ্ধা।সে যদি ভালো লড়াই করতে না পারতো,তাহলে সে এখানেই থাকত।আমাদের অধিনায়ক মইনকে ছাড়া কোন বড় লড়াইয়ে যায় না।গত সপ্তাহে মইন ও তার দল পুরো এক কোম্পানি পাকসেনাকে ধবংশ করে দেয়।

মা চোখের পানি মুছে,এবং সৈনিককে বলে মইন আসলে বলো,আমরা ভালো আছি।তিনি হাটতে থাকলেন,সৈনিক জিজ্ঞেস করলো,কি ব্যাপার মইনের সাথে দেখা করবেন না?
মইনকে বলো দেশ স্বাধীন হলে আমাদের মাঝে দেখা হবে।

বাবু মাকে বললো,মা ভাইয়ার সাথে দেখা করলে না কেনো?

নারে বাবা।এখন আর আমার কোন ভয় নাই।আমার খালি ভয় হতো,মইন দুর্বল,চোখে কম দেখে,ছেলেটা লড়াই করতে পারবেতো।মনে একটা দ্বিধা ছিলো,তাই যাচাই করতে আসছিলাম।আমার আর কোন দ্বিধা নাই,আমার মইন আর দশটা ছেলের মতোই লড়ছে।

এমন ছেলের মা কি কখনো কাঁদতে পারে?দেখিস আমরা জিতবোই।আমরা কখনো হারতে পারি না।

১৯৭৬ সালের ১৬ই মে ফারাক্কা লং মার্চের দিনটি রাজশাহী থেকে(সাংবাদিক মোনাজাতউদ্দিনের বর্ননা থেকে)

আজকের অনেক পাঠকের জানা নাই যে,১৯৭৬ সালের ১৬ই মে মজলুম জননেতা মাওলানা ভাসানির নেতৃত্বে রাজশাহীর আলিয়া মাদ্রাসা প্রাঙ্গন থেকে পদ্মা নদীর পানির ন্যায্য হিস্যার দাবীতে ঐতিহাসিক লং মার্চ ফারাক্কা অভিমুখে রওয়ানা হয়।ন্যায্য পানি ও পরিবেশ রক্ষার জন্য এটিই সবচেয়ে মানবিক ও অহিংস গনমিছিল এখন পর্যন্ত।

প্রয়াত সাংবাদিক মোনাজাত উদ্দিন যিনি বাংলাদেশের মফস্বল সাংবাদিক ও সরেজমিন সাংবাদিকতার পথিকৃত, তার একটি স্মৃতিকথা থেকে আমি সে দিনটির বিস্তারিত বিবরন পাই।তাই আমি বর্ননা করবো ওনার নিজের জবানীতে(ইষত সংক্ষেপিত,কারন কাহিনী ব্যাপক বড়)-

(মোনাজাত উদ্দিনের জবানী)-এ বছরটা আমি অনেকটা বেকার,কারন আজাদ পত্রিকা বন্ধ হয়ে গেছে।অবশ্য কয়েকটি পত্রিকার হয়ে ফ্রি ল্যান্সার হয়ে কাজ করছি উত্তর অঞ্চল প্রতিনিধি হয়ে।সে সময় ঢাকার সংবাদ পত্রিকা থেকে ফোন,কালকে ১৬ই মে ১৯৭৬ ঐতিহাসিক ফারাক্কা মিছিল হবে,(না আমাকে তা কাভারেজ করতে বলা হয়নি),ঢাকা থেকে যে দুজন সাংবাদিক আসবে তাদের থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।কি আর করা যেহেতু আমার স্থায়ী কোন চাকুরী নেই।।যথারিতি তারা এলো,তাদের সব আয়োজন সম্পন্ন করলাম।তাদের আর নাম বললাম না,কারন পরবর্তী কৃতকর্মের জন্য তারা লজ্জা পাবে।রাতে তাদের একজন ডেকে বললো,হাতে ইশারা করে(বোতলের সাইজ) এখানে রাজশাহীতে এটা পাওয়া যাবে,কি আর করা যেহেতু তারা সংবাদের লোক না এনে দিলে যদি নারাজ হয়,বস্তুত চাকুরীটা আমার খুবই দরকার,তাই এনে দেওয়ার ব্যবস্থা করলাম।দ্বিতীয়জন আমাকে আড়ালে নিয়ে গিয়ে দুই আঙ্গুল ফাক করে বললো এটির ব্যবস্থা করা যাবে,আমি রীতিমত স্তম্বিত,শেষ পর্যন্ত কি তারা আমাকে মাগীর দালাল ঠাওরালো।আমি তাকে কৌশলে এড়ালাম।

পরের দিন আমরা আলিয়া মাদ্রাসা প্রাঙ্গনে গেলাম,ভাসানি তার অগ্নিবর্ষন বক্তিতা দেওয়া শুরু করলো।স্টেজের ডানদিকে এই খান দিয়েই ভাসানি ব্যক্তিতা শেষ করে নামবে।তাই বিবিসি,ভয়েজ অব আমেরিকা,রয়টার ও সব ভালো ভালো নামিদামি সাংবাদিকরা সেখানে অবস্থান নিয়েছে।আমি ও অখ্যাত সাংবাদিকরা বাম পাশে অবস্থান নিলাম,সাথে আমার পুরোন মডেলের ক্যামেরা।

ভাষন শেষ,উত্তেজনার বশে মাওলানা ভাসানি হঠাত করে ডান দিক দিয়ে না নেমে বাম দিক দিয়ে নামা শুরু করলেন ফলে বিপুল জনতা তাকে অনুসরন করা শুরু করলো।আর পড়বি তো পড় একেবারে আমার সামনে ভাসানি নিজে ফলে আমিই প্রথম তার সেই ঐতিহাসিক ছবি তোলার সুযোগ পেলাম।ছবি তুলেই গেলাম রাজশাহী টিএন্ডটি অফিসে,ঢাকায় ফোন করতে।সেখানে গিয়েই জানলাম গতরাতে বাজ পড়ে টিএন্ডটি অফিস অচল,তাই ততক্ষনাত বুঝলাম অন্য কোন সাংবাদিক এ খবর বা ছবি এখান থেকে পাঠাতে পারবেনা।

সেখান থেকে সোজা বাস স্ট্যান্ড হয়ে ঢাকা।রাত ১১টায় ঢাকা নামলাম,সেখান থেকে বংশাল সংবাদ অফিস।গিয়ে দেখি বার্তা সম্পাদক হতাশ হয়ে বসে আছে,কারন শুধু সংবাদ নয় সকল পত্রিকা কোনো তাজা নিউজ পায়নি রাজশাহী থেকে।আমাকে দেখে বার্তা সম্পাদক লাফ দিয়ে উঠলেন,জিজ্ঞেস করলো মোনাজাত তুমি?কি এনেছো,ছবি রিপোর্ট সহ?এই সবাই মেশিন স্টার্ট দেও,এক্ষূনি।মোনাজাত তুমি কি খাবে আগে বলো।তোমাকে বিধংশ দেখাচ্ছে।সবাই খুব ব্যস্ত হয়ে উঠলো।

সম্পাদক আহমেদুল কবির গভীর রাত পর্যন্ত প্রেসে ছিলেন,এটির জন্য।গভীর রাতে বার্তা সম্পাদক এসে আমাকে জানালো,সম্পাদক সাহেব তোমাকে ডাকছে।
আমি আস্তে করে ওনার রুমে ঢুকলাম,সালাম দিলাম।উনি আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন,কিছুক্ষন পর বললেন,মোনাজাত আজকে তুমি আমার কাছে কিছু চাও?

আমি আস্তে করে বললাম,স্যার একটা চাকুরী?আমার স্যার একটা চাকুরী খুব দরকার।

এবার পাঠকদের জানাই,এই অসম্ভব দামী রিপোর্টের জন্য ওনার এই অতি ক্ষুদ্র অনুরোধ সম্পাদককে বিস্মিত করেছিলো।তিনি চাকুরীটি পেয়েছিলেন।

স্টালিন গ্রাদের যুদ্ধঃ মানব ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর প্রতিরোধের লড়াই।

কয়দিন আগে আমি জানার চেস্টা করছিলাম মানব ইতিহাসের সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী প্রতিরোধ লড়াই কোনটি ছিল?সবরকম তথ্য উপাত্ত অনুযায়ী দেখা যায় স্টালিনগ্রাদের প্রতিরোধ লড়াই এক্ষেত্রে শীর্ষে।অবশ্যই সাম্রাজ্যবাদি মিডিয়া ওপুজিবাদি বিশ্ব বরাবরই তা উপেক্ষা করে আসছে।কারন এরা কখনো মানবতা ও মানুষের মুক্তির জন্য লড়াই করেনি।স্টালিনগ্রাদ যুদ্ধের তাতপর্য বুঝতে গেলে আধুনিক রাশিয়ান ফেডারেশনের ইতিহাস জানা জরুরী।যদিও আজ সোভিয়েত রাশিয়া পৃথিবীর মানচিত্র থেকে বিলুপ্ত হয়ে রাশিয়ান ফেডারেশনে পরিনত হয়েছে।আজ অনেকেই জানেনা অগনিত সোভিয়েত বীর যোদ্ধার কথা,যারা ফ্যাসিবাদের কবল হতে শুধু রাশিয়াকেই নয়,সমগ্র পৃথিবীকে রক্ষা করেছে।

স্টালিনগ্রাদের অবস্হান বর্তমান রাশিয়ার ভল্গগ্রাদ নগরীতে।মস্কোর উপকন্ঠের লড়াইয়ে জার্মানীর সেন্টার গ্রুপের চুড়ান্ত পরাজয়ের পর রুশ-জার্মান রনাংগনে সাময়িক স্বস্তি নেমে আসে।কিন্তু অবকাশকালিন সময় দীর্ঘ হতে থাকে।সোভিয়েত সমরবিভাগ জানতো অবকাশকালিন সময় যত দীর্ঘ হবে শত্রুর আক্রমন ও লড়াই তত ভয়ন্কর হবে।তাদের আশন্কা সত্য হয়েছিলো।পশ্চিমদিক থেকে মস্কো অভিমুখে আক্রমন ব্যর্থ হওয়ায় জার্মান ফৌজ যে এবার দক্ষিনে কোন জায়গা থেকে মস্কো অভিমুখে আক্রমন শুরু করবে তা যেমন সোভিয়েত সেনামন্ডলী জানতো,তেমনি জার্মানী সেনাপতি মন্ডলী ও জানতো।ফলে শুরু হয় গোপনে ব্যাপক সেন্যযোজন।

কোন পক্ষই সরাসরি শহরের নাম উল্লেখ করতো না।সোভিয়েতরা বলতো দক্ষিনের সেই মহান শহর,যেখানে সংঘটিত হচ্ছিল তাদের সেরা সেরা সব পেশাদার লড়াকু ডিভিসন গুলো।সাথে সাথে সোভিয়েত ফৌজের সবচেয়ে শক্তিশালী রিজার্ভ ফ্রন্টগুলো জড়ো হচ্ছিল স্টালিনগ্রাদে।

লড়াই শুরু হয়েছিলো ১৭ জুলাই১৯৪২ এ,শেষ হয়েছিলো ২রা ফেব্রুয়ারীতে১৯৪৩।লড়াই চলছিলো ২টি পর্যায়ে।প্রথমটি হলো প্রতিরোধের যুদ্ধ,এটি চলে ১৭ জুলাই থেকে ১৮ নভেম্বর ১৯৪২ পর্যন্ত।২য় পর্যায়ের লড়াই চলে ১৯ নভেম্বর থেকে শুরু হয়ে সোভিয়েত বাহিনীর প্রচন্ড কাউন্টার আক্রমনের মাধ্যমে,যা জার্মান ফৌজের চুড়ান্ত পরাজয়ের মাধ্যমে শেষ হয় ২রা ফেব্রুয়ারী ১৯৪৩ এ।

১৯৪২ সালের জুলাই থেকেই নাৎসিবাহিনী স্টালিন গ্রাদের শহর অন্চল গুলোতে বিমান আক্রমন শুরু করে ।পযার্য়ক্রমে শহরের ভিতরের দিকে প্রবেশ করে রেলস্টেসন ও গুরুত্বপূর্ন অবকাঠামো দখল করে ফেলে।লড়াই এমন আকার ধারন করেছিলো যে একদিনে ১১ বার রেলস্টেশন পরস্পরের হাতছাড়া হয়েছিলো।

লড়াই কঠোর রাস্তার লড়াইয়ে পরিনত হয়,সোভিয়েত ফৌজ লড়ছিল প্রতিটি অক্ষত বাড়ির জন্য।প্রধান আক্রমনটি চালাচ্ছিলো নাৎসিবাহিনির ষস্ঠ আর্মি গ্রুপটি নেতৃত্বে ফিল্ডমার্সাল পাউলুস,এ বাহিনির ডান ও বাম বাহু রক্ষা করছিলো যথাক্রমে রোমানিয়ান ও ইটালিয়ান বাহিনিগুলো।মুলত নাৎসিবাহিনি স্টালিন গ্রাদ এ উপস্হিত হওয়ায় সোভিয়েত রাশিয়া শুধু দক্ষিন দিক হতে আক্রমনেরই সম্মুখিন হয়নি,বরং ককেশাসের সমগ্র তেলসমৃদ্ব এলাকা যেমন-দন নদী অঞ্চল,গ্রোজনি,আজারবাইজান হতে বিচ্ছিন্ন হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দেয়।ফলে সোভিয়েত বাহিনী তার সবচেয়ে বাছাই করা রিজার্ভ ও পোড়খাওয়া বাহিনীগুলো নিয়ে রুখে দাড়ায়।শুরু হয়ে যায় ভল্গা পাড়ে ইতিহাসের সবচেয়ে রত্তক্ষয়ী এক মহাকাব্যিক লড়াই।

লড়াইয়ের চুড়ান্ত পর্যায়ে সোভিয়েত ফৌজ থেকে অংশ নেয় ১১,৪৩,৫০০ জন ও নাৎসি পক্ষে ১০,১১,০০০জন।নাৎসিরা ভলগার পশ্চিম পাড়ে মামায়েভ টিলার অবস্হান বাদে সব দখলে নেয়।ঐ অবস্হান এর ভার দেয়া হয় জেনারেল ভাসিলি চুইকভের উপর।দায়িত্ব নেয়ার পুর্বে তাকে জিজ্ঞেস করা হয়,এ দায়িত্বকে আপনি কিভাবে মুল্যায়ন করবেন।তার উত্তর ছিলো সংক্ষিপ্ত-আমরা শহরটিকে রক্ষা করবো অথবা মড়বো।নদী পাড় হয়ে এসে কমান্ড পোস্টে পৌছে তিনি সর্বপ্রথম আদেশ দেন নদী পাড় হওয়ার সমস্ত উপকরন ধবংশ করার।তিনি তার সেন্যদের বলেন,আমাদের জন্য ভলগার ওপাড়ে কোনো জায়গা নেই।আজ থেকে যে নদী পাড় হওয়ার চেস্টা করবে,কোটমার্সাল তৎক্ষনাৎ কার্যকরি হবে,তার পাশের সংগী তাকে গুলি করে মারবে।২৭জুলাই জারি করা হয় প্রতিরক্ষা বিষয়ক ২২৭ নং আদেশ(এক পা ও পিছু হঠা চলবেনা)।লড়াই চলাকালে তা খুব কাজে এসেছিল।

২৭ সেপ্টেম্বর ১৯৪২ সবচেয়ে প্রবল আঘাত হেনেছিলো নাৎসিবাহিনি।সেদিন এমন কঠিন পণ করা চূইকভ পর্যন্ত টিকতে না পেরে সর্বোচ্চ হাই কমান্ডের কাছে তার সেন্যদের বাচানোর জন্য নদী পার হবার আদেশ চান।কিন্তু হাইকমান্ড তার দাবী অগ্রাহ্য করে তাকে সেখানেই সেন্যদের সাথে থেকে প্রানত্যাগ করার জন্য আদেশ দেন।সমগ্র জার্মান ফৌজ সেদিন চুড়ান্ত শক্তি নিয়োগ করে চুইকভের ডিভিসনকে নদীতে ফেলে দেওয়ার জন্য।চুইকভের ডিভিসনকে রক্ষার্থে এগিয়ে আসে ভল্গা ফ্লোটিলার সোভিয়েত নৌসেনারা,তাদের সমর্থনে আরো এগিয়ে আসে সোভিয়েত বিমান বাহিনী। সোভিয়েত বিমান বাহিনী সেদিন চুইকভের ডিভিসনকে রক্ষা করতে তার সমগ্র রিজার্ভ বাহিনীকে নিয়োগ করে।ফলে আক্ষরিক অর্থেই লড়াই জল,স্থল ও আকাশে ছড়িয়ে পড়ে।চুইকভ সেদিন মন্তব্য করে ছিলো,এ রকম আরেকটা আঘাত এলে আমরা ভলগাতে গিয়ে পড়বো।পরে পরাজিত জেনারেল পাউলুশ স্বীকার করেছিলো,চুইকভের ডিভিসনের ঐদিন টিকে যাওয়া তার বাহিনীর আক্রমনাত্বক মনোভাবের দারুন ক্ষতি করেছিলো।

২রা ফেব্রুয়ারি,১৯৪৩ নাৎসিবাহিনি সাড়ে ছয় লাখ সেন্য নিয়ে ধবংশ হয়ে যায়,মাত্র ৯১০০০জন জীবিত থাকে।৯১ হাজারের মধ্যে শেষ পর্যন্ত মাত্র ৬হাজার জন জীবিত থাকে।যুদ্ধ চলেছিল বরাবর ২০০ দিন,দুই সেনাপতির উপরেই ২০০ দিনের চাপের ফল দেখা দিয়েছিল,ভাসিলী চুইকভ তীব্র উত্তেজনার ফল অনুযায়ী কঠিন একজিমায় আক্রান্ত হয়েছিলেন আর পাউল্যুস মুখের পেশিতে পক্ষাগাত আক্রান্ত হয়েছিলেন।

চুইকভের ডিভিসনের প্রতিরোধের সেই স্থানটি যা মামায়েভ কুরগান টিলা নামে পরিচিত ১৯৬৭ সালে সেখানে লড়াইয়ের স্মৃতিতে ১টি ভার্স্কয নির্মিত হয়,যা ৮৫মিটার উচ্চতা নিয়ে পৃথিবীতে সেরা,এটির নাম দি মাদারলেন্ড কলিং।

সম্রাট আকবর ও মুসলমানী প্রসঙ্গ।

ইতিহাসের এইদিনে এই ভ্যালেন্টাইন ডে তে ১৪ ফেব্রুয়ারী,১৫৫৬ খ্রীঃ সম্রাট আকবর ১৪ বছর বয়সে দিল্লীর সিংহাসনে আসীন হন। ভ্যালেন্টাইন ডে তে সম্র...