শুক্রবার, ৩০ ডিসেম্বর, ২০১৬

বেগম সুমরো ।

আর কোন শহর ও তার ইতিহাস আমাকে এতোটা টানে না, যতোটা দিল্লী।গত এক হাজার বছরে দিল্লীকে যা প্রত্যক্ষ করতে হয়েছে ,তেমনটা আর এই উপমহাদেশের খুব কম শহরের ভাগ্যে জুটেছে।ডিকেন্সের “আ টেল অভ টু সিটিজ” উপন্যাসে যেমনটা করে শুরুতেই বলা হয়েছে-It was the best of times, it was the worst of times, it was the age of wisdom, it was the age of foolishness , দিল্লী ঠিক তেমনি সময় ইতিহাসের অনেকটা সময়ে কাটিয়েছে।এই বিস্মৃত সময়ের একটা হারিয়ে যাওয়া চরিত্র হলো মাদাম সুমরো।আমি এই ভদ্রমহিলার ব্যাপারে বেজায় কৌতুহলী ছিলাম।বস্তুত অষ্টাদশ শতকের এই পর্বে আর কোন উল্লেখ্যযোগ্য চরিত্র আমার মনে এতো দাগ কাটে নাই।ডিকেন্সের মতো করেই ঐতিহাসিকরা এই সময়টাকে উল্লেখ করেছেন “গারদি কা ওয়াক্ত” বা সময়ের চুড়ান্ত খারাপ পর্ব।এই সময়েই দিল্লীর রাস্তা থেকে কুড়িয়ে আনা একটি সাড়ে চার ফুট উচ্চতার বালিকা যাকে এক কোটা ওয়ালীর থেকে আনা হয়েছিলো সেই পরবর্তী ৫৫ বছর অতীব দক্ষতার সাথে দিল্লীর একটা অংশ শাসন করেছিলো,যখন সাম্রাজ্যগুলো টলটলায়মান এবং কেউ নিরাপত্তার সাথে বাস করতে পারছিলো না।নেতৃত্বের সহজাত উপস্থিতি আর কুটনৈতিক দক্ষতার জন্য বেগম জোয়ানা নোবিলিস “সমরু” অপ্রতাশিতভাবে অষ্টাদশ শতকে একজন স্মরনীয় মহিলা হয়ে উঠেন।কাশ্মীরি বালিকা ফারজানা কিভাবে বেগম সুমরো হয়ে উঠেন?যাকে মুঘল সম্রাট দ্বিতীয় শাহ আলম উপাধি দেন জেবউন্নিসা ,যিনি সম্রাটের কন্যাসম হয়ে উঠেন ক্রমশ।
শুরুটা হয় বেশ কয়েক দশক আগেই, নাদিরের দিল্লী শেকিং এর পরই মোঘল সাম্রাজ্যের অন্তিম ঘন্টা বেজে যায়।যে সময়ের কথা বলছি, তখন ক্ষমতায় মোঘল সম্রাট দ্বিতীয় শাহ আলম।যার পরোয়ানা কেবল উত্তর দিল্লীর পালামের আশেপাশে চলতো।যিনি তখন সাকুল্যে ৫০০০ সৈন্যের অধিকারী।অনেক স্বাধীন সামন্তেরও এর থেকে বেশী সৈন্য ছিলো।ফলে দিল্লীসহ আশেপাশে জঙ্গুলে আইন ফিরে এলো।কেউ কাউকে মানতো না।নাগরিক জীবন পুরোপুরি ব্যাহত।মুঘল গভর্নররা নিজ নিজ পরগনায় স্বাধীনভাবে শাসন কায়েম করেছিলো।শিখ আর মারাঠাদের মতো শক্তিগুলো নিজেদের সাম্রাজ্য বৃদ্ধি করছিলো।আর ক্লাইভের লুন্ঠনে অনুপ্রানিত হয়ে ইউরোপীয় বনিকের দল শাসকে পরিনত হচ্ছিলো।প্রত্যেক ইউরোপীয় বনিক কাম ভাড়াটে সৈন্যের মনে শাসক হওয়ার সুতীক্ষ্ণ ইচ্ছা।দলে দলে ইউরোপ থেকে মার্সেনারি সৈন্য ভারতে আসছিলো।মার্সেনারি সৈন্যদের একটা চুড়ান্ত তুঙ্গীয় অবস্থা চলছিলো।সবাই সর্বোচ্চ নিলামকারীর কাছে নিজেদের সার্ভিস বিক্রি করছিলো।সাথে করে তারা নিয়ে এসেছিলো, ইউরোপের বন্দুক আর বারুদের শক্তি।
তেমনি সময়ে চক্রান্তের এই ঘোলা পানিতে যথারীতি অস্ট্রিয়া থেকে এলেন ওয়াল্টার রেইনহার্ট সমব্রে ১৭৫০ সালে। ১৭৬০ খ্রীঃ সমব্রে মীর কাসিমের অধীনের বাহিনীতে যোগ দেন।উনি পাটনায় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর হাতে মীর কাসেম যখম মথিত হচ্ছিলো ,এই সময়টাই গিয়ে হাত লাগান।কাসিম পাটনার দখল পান।দক্ষ যোদ্ধা সমব্রের হাতে প্রায় ১৫০ ইংরেজ সৈন্যের প্রানহানী ঘটে।ইংরেজ ঐতিহাসিকরা এজন্য সমব্রের নাম ইতিহাসে “বুচার অভ পাটনা” বলে অভিহিত করে যান।সেই সমব্রে একদিন দিল্লীর চাদনি চকের চৌরিবাজারের খানুম জানের কোটায় বাইজির আসরে ১৫ বছরের ছোট খাটো আট-সাট শরীরের ফারজানাকে দেখেন।উনি তার প্রেমে পড়ে যান।তাকে তার হেরেমে নিয়ে তুলেন।সে সময় দেশীয় রাজা-রাজরাদের মতো ইউরোপীয়রাও হেরেম মেইন্টেইন করা শুরু করেছিলো।সমব্রেও করতো ,তারও বেশ কিছু রক্ষিতা ছিলো,যেমন বড়ি বিবি।তাও তার হৃদয় মন দখল করে নেয় ফারজানা জেবউন্নিসা।তিনি তাকে বিবাহ করেন।ফলে ফারজানা হয়ে যান মিসেস সমব্রে ,সেখান থেকে ভারতীয় উচ্চারনে সুমব্রো হয়ে বেগম সুমরো।তারা দিল্লীতে বসবাস করতে থাকেন।আর সমব্রে মার্সেনারি সৈন্য হয়ে তার নিজস্ব দল নিয়ে বিভিন্ন রাজা-রাজরাদের বাহিনীতে খেপ মেরে বেড়াতেন।এভাবে ১৭৭৩ সালে আগ্রার পশ্চিমের জাট দস্যু সুরজমলের বংশধর ভরতপুর বল্লভগড়ের দিগ রাজাদের হাতে আগ্রার পতন ঘটে যায়।মোঘল সম্রাটের নিজের আর তাকত নাই ,তার পুর্ব পুরুষের সমাধি আর আগ্রা দুর্গ রক্ষা করার।তিনি সাহায্য চাইলেন আফগান রোহিলা দলপতি নাজাফ খানের।সে এসে জাট দস্যু দিগ রাজাকে আগ্রা থেকে তাড়ালেন।রোহিলারা পেশাদার যোদ্ধা,তাই জাটরা তাদের কাছে নিয়মিত শত্রু।আফটার অল, তাদের নেতা আরেক সিনিয়র নাজাফ খানের হাতেই পরাক্রমশালী জাট দস্যু সুরজমলের মৃত্যু হয়।এখনের নাজাফ খান জাটদের প্রতিরোধে বিচলিত হননি।কিন্তু তার জয়ে ঘাম ঝড়িয়ে দিয়েছে সমব্রের নেতৃত্বে তার ভাড়াতে দল।নাজাফ খানের ব্যাপারটা ভালো লাগে।জয়ী হয়ে সমব্রেকে বন্দী নয়,বরং প্রস্তাব দেন তার বাহিনীর সাথে কাজ করবেন কিনা? সেই সময়ে ভাড়াটে সৈনিকরা ভীষন দল পাল্টাতো।সমব্রেই তখন পর্যন্ত ১৪ বার দল বদল করেছে।এবারও করলো।নাজাফ খানের সাথে জুটে গেলো।সাথে করে পেলো দিল্লীর অদুরে সারাদানায় বিশাল জায়গীর।সমব্রে সাহেব আগ্রার কোতোয়ালের দায়িত্বও কিছুটা সময় পালন করেন। এখানেই বেগম সুমরো তার জীবনের পরবর্তী ৫৫ বছর কাটান একটা সু-শৃংখল বাহিনীর কত্রী হয়ে।কিন্তু সমব্রে সাহেব বেশীদিন বাঁচেন নি। ১৭৭৮ খ্রীঃ এ তিনি মারা যান।
বেগম সুমরো এর পর তার ৪হাজার শক্তিশালী বাহিনীর সাহায্যে অনেক লড়াই পরিচালনা করেন, যে বাহিনীতে প্রায় ১০০ জনের বেশী ইউরোপীয় অফিসার ছিলেন।১৭৮৩ সালে শিখ বাহিনীর সেনাপতি বাঘেল সিং ৩০ হাজার সৈন্য নিয়ে এসে দিল্লীকে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলে।যেখানে এসে বাঘেল সিং সৈন্য নিয়ে অবস্থান করে,সেই জায়গাটার নাম এখনো তিস হাজারি। মুঘল সম্রাট শাহ আলম ২য় বেগম সুমরোকে আহবান জানালেন এই অচলাবস্থা কাটাতে।বেগম সুমরো সফল কূটনীতি চালালেন।দিল্লীতে তিনি শিখদের জন্য ৮টি গুরুদ্বোয়ারা তৈরী করলেন আর নগদ অর্থ প্রদান করেন বাঘেল সিং কে পাঞ্জাবে ফেরত পাঠালেন।সম্রাট খুবই সন্তুষ্ট হলেন।কিন্তু ৫ বছর পরই সম্রাটের ভাগ্যে ভীষন ঘটনা ঘটে গেলো।আফগান কুখ্যাত রোহিলা দলপতি গুলাম কাদির এসে দিল্লী দখল করলো।এই নাদিরের দিল্লী লুটের পর যেই দিল্লী দখল করে,প্রথমে এসে সম্রাটকে ধরে গুপ্ত ধনের জন্য।কিন্তু নিঃস্ব সম্রাট কিছুই দিতে পারেনা।গুলাম কাদির এতে ক্ষুদ্ধ হয়ে সম্রাটের দুচোখ উৎপাটন করে ফেলে।সাথে করে এই অন্ধ অসহায় সম্রাটকে প্রত্যেকদিন ভীষন নিগ্রহ আর অনাহারে রাখা শুরু করলো।বেগম সুমরোর কাছে এই সংবাদ পৌছামাত্রই তিনি তার বাহিনী নিয়ে দিল্লীর দিকে আগানো শুরু করলেন।একিই সাথে তার মারাঠি মিত্র গোয়ালিয়রের মাহাদজি সিন্ধিয়াকেও আহবান করলেন অন্ধ সম্রাটের এই দুরবস্থায় এসে সাহায্য করতে।উভয়ের মিলিত বাহিনীর কাছে গুলাম কাদির পরাজিত হয়ে বন্দী হন।বেগম সুমরোর নির্দেশে গুলাম কাদিরের দুই চোখ উৎপাটন করা হয়।সেই দুই চোখ পাত্র করে এনে মুঘল সম্রাটকে হাত দিয়ে উপলদ্ধি করানো হয়।গুলাম কাদিরের লাশ খুনী দরোওয়াজায় ঝুলিয়ে রাখা হয়।ঐতিহাসিকেরা বলে ,কাদিরের ঝুলানো লাশ থেকে নিচে রক্ত পরতো আর এক ভীষন দর্শন কালো কুকুর এসে সে রক্ত চেটে খেতো।কেউ কখনো এর আগে এই কুকুর দেখেনি।বেশ কয়দিন পর কাদিরের লাশ আর কালো কুকুর দুইওই একেবারে উধাও হয়ে যায়।
সম্রাট ২য় শাহ আলম কৃতজ্ঞতা আর আনন্দ থেকে বেগম সুমরোকে উপাধি দেন বিলভড ডটার বা অলংকারশোভিত সুন্দরী কন্যা ওরফে জেবউন্নিসা।আর মাহাদজি সিন্ধিয়াকে উপাধি দেন “ভাকিল এ মুতালিক” বা সন্মানিত অভিভাবক।
বেগম সুমরো এরপরে একটা বর্নিল সময় কাটান দিল্লীওয়ালাদের সাথে ,ইউরোপীয়দের সাথে।কিন্তু একটা ভুল করে বসেছিলেন।তিনি আইরিস মার্সেনারি সৈনিক জর্জ থমাসের প্রেম এ পড়েন,যিনি তখন দিল্লীতে জাহাজি সাহিব বলে পরিচিত ছিলেন,কারন জাহাজের ডকশ্রমিক হিসেবে তার ভারতে আগমন ঘটে।জর্জ তার অত্যান্ত সুদক্ষ যোদ্ধা ছিলেন।কিন্তু এসময়েই তিনি আবার ফরাসী মার্সেনারি সৈনিক আঁমাদ লেভাসুর প্রেমে পড়ে তাকে বিয়ে করে ফেলেন।ফলে জর্জ ক্ষিপ্ত হয়ে তার বাহিনী ছেড়ে মারাঠা বাহিনীতে গিয়ে যোগ দেন।১৭৯৯ সালে লর্ড ওয়েলেসলি(মার্কুয়েজ ওয়েলেস্লি) আর ডিউক অভ ওয়েলিংটনের বাহিনীর হাতে শ্রীরংগাপটনম এর যুদ্ধে টিপু সুলতান ওরফে টিপু সাহিবের বীরের মতো মৃত্যু হয়।এরপর ১৮০৩ সালে কোম্পানীর সাথে মারাঠাদের যুদ্ধ শুরু হয়।বেগম সুমরো মারাঠাদের পক্ষ নেন।এরপর ১৮০৫ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া বাহিনী দিল্লীতে অভিযান চালান মুঘল সম্রাটকে মারাঠাদের হাত থেকে নিজেদের কব্জায় নিয়ে নেয়ার জন্য।লর্ড লেকের হাতে মারাঠাদের চুড়ান্ত পরাজয় ঘটে।নতুন গভর্নর জেনারেল কর্নওয়ালিসও বেগম সুমরোর প্রতি প্রসন্ন ছিলেন কারন দিল্লীর যুদ্ধে অনেক বন্দী ইংরেজ সৈনিকদের বেগম সুমরো শিখ আর মারাঠাদের হাত থেকে সফল কূটনৈতিকতার মাধ্যমে রক্ষা করেছিলেন।বেগম সুমরোর মন্ত্রী দিওয়ান রাই সিং ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহর লাল নেহরুর পুর্বপুরুষ ছিলেন।দিল্লীতে বেগম সুমরোর চাদনিচকে যে প্রাসাদ ছিলো ,তা এখনো টিকে আছে।সেখানে এটা ব্রিটিস যুগে ছিলো লয়েডস ব্যাংকের কার্যালয় আর স্বাধীন ভারতে সেটা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অধীনে পরে। তার আরেকটি প্রাসাদ যেটা লাল কিল্লার সামনে ছিলো “ভাগিরথী মহল” সেটাও এখনো আছে।যেটা এখন দিল্লীর সুবিশাল ইলেক্ট্রিক্যাল ও ইলেকট্রিনিক্স মার্কেট।
১৮৩৬ সালে বেগম সুমরোর মৃত্যু হয়।দীর্ঘজীবনে তিনি দিল্লীর ১ম ইংরেজ রেসিডেন্ট ডেভিড অক্টারলোনী ওরফে লুনী সাহেবের আমল দেখেছেন তেমন আরেক রেসিডেন্ট উইলিয়াম ফ্রেজারের সময়েও তিনি জীবিত ছিলেন।
বিঃ দ্রঃ বর্তমান ও অতীতের বেগম সুমরোর প্রাসাদের ছবি ইন্টারনেট হতে প্রাপ্ত।




কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

সম্রাট আকবর ও মুসলমানী প্রসঙ্গ।

ইতিহাসের এইদিনে এই ভ্যালেন্টাইন ডে তে ১৪ ফেব্রুয়ারী,১৫৫৬ খ্রীঃ সম্রাট আকবর ১৪ বছর বয়সে দিল্লীর সিংহাসনে আসীন হন। ভ্যালেন্টাইন ডে তে সম্র...